১০-৪০তম বিসিএসঃ বাংলা বানান থেকে আসা প্রশ্ন (ব্যাখ্যাসহ)

বিসিএস পরীক্ষায় লাখো প্রতিযোগীর ভিড়ে এগিয়ে থাকতে চাইলে বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করা আপনার জন্য সবচেয়ে স্মার্ট সিদ্ধান্ত।

১০-৪০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আসা বাংলা বানান শুদ্ধিকরণ গাইডলাইন

নিচে ১০-৪০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আসা বাংলা বানান শুদ্ধিকরণ গাইডলাইন বিস্তারিত আলোচনা করা হলো যা আপনার প্রস্তুতি অনেক সহজ করবে।

বিসিএস প্রস্তুতিঃ বাংলা বানান শুদ্ধিকরণের গুরুত্ব

বাংলা ব্যাকরণ অংশে ভালো নম্বর পেতে হলে বানান শুদ্ধিকরণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (BPSC) এর তথ্য অনুযায়ী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাংলা অংশে বানান ও বাক্য শুদ্ধি থেকে প্রায় ২-৩ নম্বর নিশ্চিতভাবে থাকে। আপনি যদি বিগত বছরের প্রশ্নগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করেন তবে বুঝতে পারবেন একই ধরনের নিয়ম বারবার পরীক্ষায় আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IER) এর স্টাডি অনুযায়ী প্রায় ৬৭% পরীক্ষার্থী শুধুমাত্র অনুশীলনের অভাবে জানা বানান ভুল করে আসে। তাই এই অংশের প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চলুন আমরা ১০ম থেকে ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় আসা গুরুত্বপূর্ণ বানানগুলো দেখে নিই।

১০ম থেকে ২০তম বিসিএস পরীক্ষায় আসা বাংলা বানান

প্রাথমিক দিকের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে বেশ কিছু মৌলিক ও কনফিউজিং বানান বারবার এসেছে। নিচে আমরা সেগুলো বিস্তারিত নিয়মের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছি।

  1. মুমূর্ষু (১০ম, ২১তম বিসিএস): শুদ্ধ বানান 'মুমূর্ষু' শব্দটির অর্থ মরণাপন্ন বা মরণোম্মুখ অবস্থা। এই বানানে প্রথম ও শেষের ম-এ হ্রস্ব-উ কার এবং মাঝের ম-এ দীর্ঘ-ঊ কার ব্যবহৃত হয়।
  2. সৌজন্য (১১তম বিসিএস): এটি একটি বিশেষ্য পদ যার অর্থ শিষ্টাচার বা ভদ্রতা। অনেকেই ভুল করে 'সৌজন্যতা' লেখেন যা ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ।
  3. পাষাণ (১২তম বিসিএস): পাষাণ একটি বিশেষ্য পদ যার অর্থ পাথর বা তুলাদন্ডের বাটখারা। আবার বিশেষণ পদ হিসেবে এটি নিষ্ঠুর বা কঠিন (যেমন পাষাণ হৃদয়) অর্থে ব্যবহৃত হয়। ণ-ত্ব বিধান অনুযায়ী ষ-এর পর ণ বসেছে।
  4. হাতি বা হাতী (১৩তম বিসিএস): বাংলা একাডেমি প্রণীত আধুনিক বাংলা বানান রীতি অনুযায়ী এখন হ্রস্ব-ই কার দিয়ে 'হাতি' লেখা হয়। তবে পূর্বের নিয়মে দীর্ঘ-ঈ কার দিয়ে 'হাতী' লেখাও শুদ্ধ ছিল। এর অর্থ হস্তী বা বারণ।
  5. বিভীষিকা (১৪তম বিসিএস): এটি একটি বিশেষ্য পদ যার অর্থ ভয়জনক দৃশ্য বা আতঙ্ক। এই বানানে প্রথম ব-এ হ্রস্ব-ই এবং ভ-এ দীর্ঘ-ঈ ব্যবহৃত হয়।
  6. মুহুর্মুহু (১৫তম বিসিএস): এটি একটি অব্যয় পদ যার অর্থ বারংবার বা বারবার। এই বানানে সবগুলো উ-কার হ্রস্ব-উ হবে এবং শেষের হ-এ রেফ যুক্ত হবে।
  7. সমীচীন (১৮তম বিসিএস): সমীচীন একটি বিশেষণ পদ যার অর্থ সঙ্গত বা উচিত। এই বানানে ম এবং চ উভয়েই দীর্ঘ-ঈ কার ব্যবহৃত হয়।
  8. শুশ্রূষা (২০তম বিসিএস): শুশ্রূষা শব্দের অর্থ প্রধানত রোগীর পরিচর্যা বা সেবা করা। এই বানানে তালব্য শ-এ হ্রস্ব-উ কার এবং শ্র-ফলা যুক্ত শ-এ দীর্ঘ-ঊ কার বসে। যে সেবা করে তাকে শুশ্রূষাকারী বলা হয়।
  9. আষাঢ় (২০তম, ২৪তম বিসিএস): নিত্য মূর্ধন্য-ষ বর্তমান এমন একটি শব্দ হলো আষাঢ়। এটি বাংলা বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস এবং এখানে স্বাভাবিকভাবেই মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হয়েছে।

উদাহরণ: ধরুন আপনি পরীক্ষার হলে 'মুমূর্ষু' বানানটি ভুলে গেছেন। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন প্রথম ও শেষ অক্ষর একই রকম হ্রস্ব-উ কার যুক্ত হয় এবং মাঝের অক্ষরটি দীর্ঘ-ঊ কার নেয়। এটি মনে রাখার একটি কার্যকরী পদ্ধতি।

মনে রাখবেনঃ বারবার লিখে অনুশীলন করলে এই কনফিউজিং বানানগুলো খুব সহজেই আয়ত্ত করা সম্ভব।

২১তম থেকে ৩০তম বিসিএস পরীক্ষায় আসা বাংলা বানান

মাঝামাঝি সময়ের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে যুক্তাক্ষর ও ণ-ত্ব বিধানের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। নিচে এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো দেওয়া হলো।

  1. শুচিস্মিতা (২১তম বিসিএস): এই শব্দটির অর্থ মৃদু ও নির্মল হাসিযুক্ত। ৪টি অপশনের মধ্যে এটিই শুদ্ধ বানান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
  2. স্বায়ত্তশাসন, অভ্যন্তর, জন্মবার্ষিক (২৩তম বিসিএস): এই শব্দগুচ্ছের প্রতিটি বানান শুদ্ধ। 'স্বায়ত্তশাসন' বানানে য়-এর নিচে ত-এ ত যুক্ত হয়। 'অভ্যন্তরীণ' না হয়ে 'অভ্যন্তর' হয় এবং 'জন্মবার্ষিকী' না হয়ে 'জন্মবার্ষিক' মূল শব্দ হিসেবে বিবেচিত।
  3. দ্বন্দ্ব (২৫তম বিসিএস): দ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ বিরোধ বা সংঘাত। এই বানানে দুটি দ-এর নিচেই ব-ফলা যুক্ত থাকে। এটি বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

৩১তম থেকে ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় আসা বাংলা বানান

সাম্প্রতিক বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে বেশ কিছু কঠিন ও ব্যতিক্রমী বানান এসেছে যা পরীক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। এখানে আমরা সেই বানানগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছি।

  1. নিশীথিনী (৩১তম, ৩৩তম বিসিএস): নিশীথিনী শব্দের অর্থ রাত বা রজনী। এই বানানে প্রথম ন-এ হ্রস্ব-ই, শ-এ দীর্ঘ-ঈ, থ-এ হ্রস্ব-ই এবং শেষের ন-এ দীর্ঘ-ঈ কার বসে।
  2. আকাঙ্ক্ষা (৩১তম বিসিএস): বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে ক, খ, গ, ঘ পরে থাকলে পদের অন্তঃস্থ 'ম্' স্থানে অনুস্বার (ং) বা বিকল্পে 'ঙ' লেখা যায়। তবে ক্ষ-এর পূর্বে সর্বত্র 'ঙ' হবে। তাই আকাঙ্ক্ষা বানানটি সঠিক।
  3. ঊর্ধ্ব (৩৩তম বিসিএস): অনেকেই ভুল করে উর্ধ্ব লেখেন কিন্তু শুদ্ধ বানান হলো 'ঊর্ধ্ব'। এখানে দীর্ঘ-ঊ ব্যবহৃত হয়।
  4. পিপীলিকা (৩৩তম বিসিএস): পিপীলিকা শব্দের অর্থ পিঁপড়া। এই বানানে প্রথম প-এ হ্রস্ব-ই এবং দ্বিতীয় প-এ দীর্ঘ-ঈ কার বসে।
  5. শ্বশুর (৩৫তম বিসিএস): এই বানানে তালব্য শ-এর নিচে ব-ফলা থাকে এবং পরে তালব্য শ-এ হ্রস্ব-উ কার বসে।
  6. প্রতিযোগিতা (৩৫তম বিসিএস): প্রতিযোগী শব্দে দীর্ঘ-ঈ কার থাকলেও তা-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বিশেষ্য পদ গঠন করার সময় হ্রস্ব-ই কার হয়ে যায়। তাই 'প্রতিযোগিতা' বানানটি শুদ্ধ।
  7. মনীষী (৩৫তম বিসিএস): মনীষী একটি বিশেষণ পদ যার অর্থ তীক্ষ্ণধী বা বুদ্ধিমান ব্যক্তি। এই বানানে ন-এ দীর্ঘ-ঈ এবং ষ-এ দীর্ঘ-ঈ কার ব্যবহৃত হয়। স্ত্রীলিঙ্গে এটি 'মনীষিণী' হয়।
  8. প্রবণ (৩৬তম বিসিএস): ণ-ত্ব বিধি অনুসারে র-ফলা এরপর মূর্ধন্য-ণ ব্যবহৃত হয়েছে। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক শব্দ।
  9. নিক্বণ, সূচ্যগ্র, অনূর্ধ্ব (৩৭তম বিসিএস): এই শব্দগুচ্ছের বানানগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিক্কন না হয়ে নিক্বণ হবে এবং অনুর্ধ্ব না হয়ে অনূর্ধ্ব হবে।
  10. স্বায়ত্তশাসন (৩৮তম বিসিএস): এই প্রশ্নে কোনো সঠিক উত্তর ছিল না কারণ অপশনে দেওয়া বানানগুলো ভুল ছিল। শুদ্ধ বানানটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
  11. ত্রিভুজ (৩৮তম বিসিএস): এই শব্দটির বানান শুদ্ধ। অন্যান্য অপশনে থাকা শূণ্য, পূণ্য ও ভূবন অশুদ্ধ ছিল যার শুদ্ধরূপ হলো শূন্য, পুণ্য ও ভুবন।
  12. প্রোজ্জ্বল (৪০তম বিসিএস): এই বানানে জ-এ জ-এ ব-ফলা যুক্ত থাকে। এটি একটি অত্যন্ত কনফিউজিং বানান যা বারবার অনুশীলনের দাবি রাখে।
  13. যশলাভ, সদ্যোজাত, সংবর্ধনা (৪০তম বিসিএস): এই শব্দগুচ্ছের প্রতিটি বানান শুদ্ধ। অনেকেই ভুল করে যক্ষ্মা কে যক্ষা লেখেন বা কেবলমাত্র কে কেবল লেখেন।

যে ভুলগুলো এড়াবেন

বিসিএস প্রস্তুতি নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা বেশ কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন। নিচে সেই ভুলগুলো এবং তা এড়ানোর পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।

  1. শুধু মুখস্থ করাঃ বানান শুধু মুখস্থ করলে পরীক্ষার হলে কনফিউশন তৈরি হয়। কেন একটি বানান এমন হলো তা ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী বুঝার চেষ্টা করুন।
  2. লিখে অনুশীলন না করাঃ অনেক শিক্ষার্থী শুধু বই পড়ে বানান মনে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু খাতায় লিখে অনুশীলন না করলে বানান মনে থাকে না।
  3. আগের বছরের প্রশ্ন অবহেলা করাঃ বিগত বছরের প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া একটি বড় ভুল। বিসিএস পরীক্ষায় বারবার একই ধরনের প্রশ্ন রিপিট হয়।

প্রয়োজনীয় টুলস ও রিসোর্স

সঠিকভাবে বাংলা ব্যাকরণ আয়ত্ত করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স ব্যবহার করা আপনার জন্য সহায়ক হবে।

  • বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানঃ যে কোনো কনফিউজিং বানানের ক্ষেত্রে এটিই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
  • নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ভাষার ব্যাকরণঃ এই বোর্ড বইটি বিসিএস প্রিলিমিনারি ও written উভয় পরীক্ষার জন্য অপরিহার্য একটি জিনিস।
  • বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংকঃ BPSC ও অন্যান্য সরকারি চাকরি পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক সমাধান করলে আপনার প্রস্তুতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

এডভান্স টিপস

আপনি যখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকার জন্য কিছু এডভান্সড নিয়ম ফলো করতে পারেন। প্রতিদিন অন্তত ১০টি নতুন এবং কঠিন বানান খাতায় লেখার অভ্যাস করুন। ণ-ত্ব এবং ষ-ত্ব বিধানের প্রতিটি ব্যতিক্রমী নিয়ম আলাদা নোটে লিখে রাখুন। আপনি যখন বারবার একই জিনিস রিভিশন দেবেন তখন আপনার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যাবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাংলা বানান থেকে কত মার্কস আসে?
উত্তর: বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাংলা ব্যাকরণ অংশে সাধারণত বানান ও বাক্য শুদ্ধিকরণ থেকে ২ থেকে ৩ নম্বর নিশ্চিতভাবে আসে। তাই এই অংশটি খুব গুরুত্ব সহকারে পড়া উচিত।

প্রশ্ন ২: বাংলা বানানের নিয়ম মনে রাখার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কী?
উত্তর: নিয়ম মনে রাখার সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হলো খাতায় বারবার লিখে অনুশীলন করা এবং ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের নিয়মগুলো বাস্তব উদাহরণের সাথে মিলিয়ে পড়া।

প্রশ্ন ৩: আমি কি শুধু বিগত বছরের প্রশ্ন পড়লেই কমন পাবো?
উত্তর: বিগত বছরের প্রশ্ন পড়লে অনেক সময় সরাসরি কমন পাওয়া যায় অথবা একই নিয়মের উপর ভিত্তি করে নতুন শব্দ আসে। তবে শুধুমাত্র প্রশ্ন মুখস্থ না করে এর পিছনের ব্যাকরণগত নিয়মটি শেখা বেশি জরুরি।

শেষ কথা

বিসিএস প্রস্তুতি একটি দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল প্রক্রিয়া। ১০ম থেকে ৪০তম বিসিএস পর্যন্ত আসা এই বাংলা বানানগুলো আপনার প্রস্তুতির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে। এখানে আলোচনা করা প্রতিটি নিয়ম ও উদাহরণ বারবার পড়ুন এবং খাতায় লিখুন। সঠিক গাইডলাইন ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি অবশ্যই সফল হবেন। আজই বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক বের করে আপনার রিভিশন শুরু করে দিন।

শেয়ার
আজকের সেরা খবর গতকালের সেরা খবর
সবার আগে কমেন্ট করুন
কমেন্ট করতে ক্লিক করুন
comment url